শ্মশানের আগুন
অমাবস্যার রাত।
গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে হিমেল বাতাসে কুয়াশা ঘন হয়ে জমেছে, যেন আকাশ থেকে কেউ সাদা চাদর মেলে দিয়েছে। চারপাশে কুকুরের দীর্ঘ হাহাকার আর দূরে পেঁচার ডাকে বুকের ভেতর শিরশিরানি জাগে। ঠিক এই রাতেই পুরনো শ্মশানটা যেন জীবিত হয়ে ওঠে—গাছের ডাল কেঁপে ওঠে, অজানা ফিসফিসানি ভেসে আসে, আর মাটির গন্ধে মিশে যায় পোড়া কাঠ আর পচা মাংসের দুর্গন্ধ।
গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করে, এই শ্মশানে মাঝরাতে এক রহস্যময় নীল আগুন জ্বলে। যারা সেই আলো দেখতে যায়, তারা আর সুস্থ অবস্থায় ফেরে না।
রাকেশ এসব গল্প শুনে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেই অমাবস্যার রাতেই, কৌতূহল তাকে শ্মশানের পথে টেনে নিয়ে গেল। সঙ্গে ছিল তার বন্ধু রাহুল। হাতে কেরোসিনের লণ্ঠন, যা কুয়াশার ভেতর অল্প আলো ছড়াচ্ছে।
শ্মশানের কাছে পৌঁছাতেই মাটি নরম হয়ে উঠল, যেন পুরনো কবরের ওপরে পা পড়েছে। হঠাৎ দূরে এক কোণে নীলচে আলো জ্বলে উঠল। আলোটা যেন নিশ্বাস নিচ্ছে—একবার উজ্জ্বল, একবার ম্লান।
“চল ফিরে যাই,” রাহুল ফিসফিস করল, তার গলার স্বর কেঁপে উঠছে।
কিন্তু রাকেশ এগোতে লাগল।
যত তারা কাছে গেল, ধোঁয়ার ভেতর অস্পষ্ট মুখ ভেসে উঠতে লাগল—চোখবিহীন, ফাঁকা গর্তের মতো কালো। গাছের ডাল থেকে ঝুলছে শুকনো, মাংসহীন দেহ, হালকা বাতাসে আস্তে আস্তে দুলছে।
হঠাৎ ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা এসে লণ্ঠন নিভিয়ে দিল। অন্ধকারে শুধু সেই নীল আগুন জ্বলছে, আর পেছন থেকে ভেসে আসছে টানা কান্নার শব্দ—যেন বহু মানুষের একসাথে হাহাকার।
রাকেশ অনুভব করল, তার ঘাড়ের পেছনে বরফ—ঠান্ডা নিঃশ্বাস লাগছে। ধীরে ধীরে পিছনে ফিরতেই দেখতে পেল এক ফ্যাকাসে মুখ—চুল এলোমেলো, ঠোঁট ছেঁড়া, হাসছে নাকি কাঁদছে বোঝা যাচ্ছে না। মুখটা যেন ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে।
তারপর হঠাৎ সেই আগুন এক লাফে উঁচু হয়ে তাকে ঘিরে ধরল। আগুনের ভেতরে দেখা গেল শত শত হাত—যেন তাকে টেনে নিচ্ছে। রাহুল চিৎকার দিয়ে দৌড়ে পালাল, কিন্তু রাকেশের চেতনা ততক্ষণে হারিয়ে গেছে।
ভোরে গ্রামের লোকেরা তাকে শ্মশানের ধারে অজ্ঞান অবস্থায় পেলো। চোখ খুলেই রাকেশ শুধু বলল—
“ওরা এখনো আমাকে ডাকছে”
এরপর থেকে রাকেশ আর রাতের বেলা বাইরে বেরোয় না।

No comments:
Post a Comment