চা শ্রমিকদের “মুলুকে চলো” আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ছোট গল্প || চন্দন রোজারিও ||

 চা শ্রমিকদের “মুলুকে চলো” আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ছোট গল্প
|| চন্দন রোজারিও ||


১.
মে মাস। আকাশে মেঘ জমেছে, কিন্তু বৃষ্টি পড়ে না। বাতাস ভারী, যেন গলা দিয়ে ঢোকার আগেই থেমে যেতে চায়।
গীতা আজও ভোরে উঠে চা—পাতা তুলতে গেছে। অন্যদিনের মতো শরীর উঠতে চায়নি, পেটটা যেন এক বালতির মতো ভারী। সাত মাস চলছে—তার প্রথম সন্তান। কিন্তু তার গর্ভধারণটা কেমন যেন অন্যরকম। শরীরে শুধু নয়, মনের ভিতরেও যেন এক অদ্ভুত টানাপোড়েন।
গীতা গাছের আড়ালে বসে পড়ল একটু। মাথায় ঝুড়ি, পাশে জলপাত্র। আশপাশে আর সব মেয়েরা ঝুঁকে ঝুঁকে পাতার ডাল ভাঙছে, কেউ মুখে গান করছে, কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে। সেই ফিসফিসানিতে এখন একটা নতুন সুর যোগ হয়েছে — “মুলুকে চলো”।
এই ডাকটা বাতাসে ভাসছে কয়েক সপ্তাহ ধরেই। কেউ সাহস করে বলছে, কেউ চুপচাপ শুনছে। অনেকেই নাকি সত্যিই হাঁটা ধরেছে। ঘর, মাটি, চাতাল, পুকুর, মা—বোনের স্মৃতি—সব যেন গলা দিয়ে চেপে বসেছে লোকজনের।
রামু, গীতার স্বামী, কয়েকদিন ধরেই পাগলের মতো আচরণ করছে। তার চোখ জ্বলে, কণ্ঠ কাঁপে, হাত কাঁপে যখন বলে—
“গীতা, বেজান দিন অপেক্ষা করেছি, আর নাই পারবো। চল, তোকে লিয়ে মুলুকে ফিরে যাই। হামদের মাটির ঘরে যাবো। এথায় থাকলে আর নায় বাঁচিবো। এথায় কান্না ছাড়া আর কিছুই নাইখে।”
গীতা চুপ করেছিল। শুধু হাতটা নিজের পেটে রেখেছিল, ধীরে ধীরে। ভয়ের কাঁপুনি বেয়ে উঠেছিল শরীর বেয়ে — এই শরীরে, এই পেট নিয়ে, এই কষ্টে — সে কীভাবে হাঁটবে শত শত কিলোমিটার? কীভাবে সামলাবে এই পেটের জান?
গীতা যখন কাজ শেষে কুঁড়েঘরে ফেরে, তখন আকাশ আরও ভারী। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ঘিরে ধরে চারদিক। পায়ের নিচে কাদা, দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে বাতাস ঢোকে।
বুড়ি মা তার পাশে বসে গরম পানি দেয়। মুখে বলে,
“আজকের চাপাতির গন্ধটা কেমন কাঁচা লাগছে রে, হঁ বুজলি  গীতা? এই বাগানটা হামদের নিজের নাই লাগে।”
গীতা কিছু বলে না। শুধু দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকে দূরের দিকে। তার পেটের ভিতর একটা নড়াচড়া হয় — যেন ভিতরের শিশু বলছে, “হামি কাঁহা আসেচি মা?”
সে মনে মনে উত্তর দেয়—
“তুই হামার পেটের ভিতরে থাকলেও জানিস, হামরা এথায় বন্দি। তোকে লিয়ে নাই জানি হামি কাহা যাবো.. জানি খালি, তুই হামার একটা জান, আর আমি আরেকটা জান। কিন্তু বাঁচন (মুক্তি) হামদের দুজনের কারোই নাইখে।”

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------

২.
চা বাগানের সকালে ভোর থেকেই এক অদ্ভুত উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে। গীতার চারপাশের নারীরা ফিসফিস করে কথা বলছে, কখনো কেউ খোলাখুলিভাবে উচ্চস্বরে ‘মুলুকে চলো’ ডাক দিচ্ছে। পেছনের পাহাড় থেকে কোকিলের ডাক যেন এক সঙ্গে তাদের সুর মেলাচ্ছে।
রামু বারবার গীতার হাতে হাত বেঁধে বলল,
“গীতা, চল হামরা যাই! আর নাই পারছি। হামদের উপর বাবু সাহেবদের যে জুলুম, এই লাঠির বেদ্না, আর দানাপিনার অভাব... হামার পেটে ভুখের লাগি, গরম লোহার মতো আগুন জ্বলে। চল, মাটির ঘরে ফিরে যাবো, আপন ভিটায়।”
গীতা চোখ মেলে দেখল রামুর মুখে অদ্ভুত এক জেদ, এক আশার আলো। সে জানত রামু ঠিক কথা বলছে। এই দাসত্ব আর বঞ্চনা কখনো শেষ হবে না বাগানে। মাটির ঘরে, তার গ্রামে, অন্তত গাছপালা, নদী আর মাঠের মধ্যে তারা ফিরে যেতে পারবে।
কিন্তু গীতার শরীর হালকা লাগছিল না। তার পেটের ভিতর ছোট্ট শিশুটি প্রায় প্রতিদিনই চঞ্চল। সে ভাবল,
“এই দেহি (শরীর) আর পায়ের কষ্ট, গরম, ধুলা আর রোদে হামি কি হাঁটতে পারবো? হামি কি হামার আর হামার পেটের ছানাকে বাঁচায়ি লিতে পারবো?”
বুড়ি মা, গীতার পাশে বসে বলল,
“বেলা বাড়ল রে, তোর ছানাটাও বড় হয়েছে। কিন্তু তোরা নাই যাবি? এই বাবু সাহেবদের জুলুমের হাত থেকে হামদের বাঁচার একটাই রাস্তা। দেশে যাই চল হামদের আপন মাটি লাগে, আপন ছায়ায় হামদের জীবন বাঁচাই।”
চা বাগানে এবার বাঁশি বাজে আর লাঠির শব্দও আসে। মিস্টার হগ, ব্রিটিশ সুপারভাইজার, রাগে কাঁপছে। সে জানে শ্রমিকরা এবার বিদ্রোহের পথে। শাসনের গোঁড়ায় কাঁপন ধরিয়েছে।
রাত পর্যন্ত রামু গীতার পিঠে হাত বুলিয়ে বলল,
“রাইত পোহাইলে বের হবো।”
গীতা নিশ্বাস ধরে রামুর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“যাতে বলছিস ? হামার দিহে (শরীর) যেন কিছু নাই বুঝে। হামার ছানাটার লাগি ডর লাগছে, এই লম্বা রাস্তা হামি যাবো ক্যামনে?”
রামু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“হামি থাকব তর কাছে। হামরা একসাথে সবাই মিলে যাবো।”
সেই রাত গীতার স্বপ্ন অদ্ভুত। পেছনের বাড়ির মাঠে ছোট্ট শিশুটি দৌড়াচ্ছে। তার পাশে রামু হাঁটছে, গীতার হাত ধরে। তারা হেঁটে যাচ্ছে, চুপচাপ, শান্ত স্বপ্নের পথে—মাটির ঘর, পুকুর, নদী।
কিন্তু ঘুম ভাঙতেই শরীরের যন্ত্রণা, ভয়ে ভাসিয়ে দেয় বাস্তবের গাঢ় ছায়া।

-------------------------------------------------------------------------------------------------------------- 

৩.
ভোর হতেই গীতার ঘর ছোট্ট জলরঙের আলোয় ভরে যায়। চা বাগানের কুঁড়েঘর থেকে উঠে আসে হাজারো মানুষের পায়ে ধূলোর ঝড়। মাটির পথে হাঁটার শুরুর আগেই গীতার হৃদয় ব্যথায় পেষিত। শরীর ভারি, পেট ঝিমিয়ে উঠছে, তবু তার চোখে অদম্য এক আশার দীপ্তি।
রামু হাতে বাঁশি নিয়ে গীতার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“চল, গীতা। এখন নাই গেলে কখন যাবি? সবকিছু ভাঙ্গেচুরে এখন হামদের যাওয়ার সময় আসেচে।”
চা বাগানের পথ এখন পরিণত হয়েছে মানুষের স্রোতে। পুরুষ, নারী, বাচ্চারা একযোগে হাঁটছে, বুকের ভিতর বাজছে স্বাধীনতার গান। কিছু জায়গায় তারা থামে, আলোচনা হয়। মিস্টার হগের লাঠির আঘাত হাওয়া হয়ে ঘুরছে চারদিকে।
গীতার পা ধীরে ধীরে হাঁটে। পেটের ভেতর শিশুটি হঠাৎ দুলতে শুরু করে, যেন সে নিজেও বুঝতে চায়, মা— এক অনিশ্চিত পথে যাত্রা শুরু করলো। পথের কাঁদামাটি, গরম রোদ, বৃষ্টির অস্থিরতা—সব কিছুই এখন তাঁর জীবনের এক নতুন অধ্যায়। গীতার শরীরের যন্ত্রণাও বেড়ে গেল। পেট কেঁপে উঠল, ব্যথা বাড়লো,  রামু চিন্তায় পড়ে গেল। তার বুকের ভিতর স্বপ্ন আর বাস্তবের যুদ্ধ হচ্ছে। সে জানত, এই পথের শেষে একটা নতুন জন্ম অপেক্ষা করছে — নতুন শিশুর, নতুন জীবনের।
তবে এক কথা স্পষ্ট—নিজ মাটিতে যাওয়ার আশা যেমন উজ্জ্বল, তেমনি যাত্রাটা ঝুঁকিপূর্ণ।

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------  

৪.
রাতের অন্ধকারে পথ চলা আরও কঠিন হয়ে উঠল। ঝড়ো হাওয়া, কাঁদামাটিতে লেগে থাকা পদচিহ্ন, আর পেটের ভিতরে শিশুর নড়াচড়া—সব মিলিয়ে গীতার শরীর ভেঙে পড়ার উপক্রম।
তারা যখন একটি বাঁশবনের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ দূর থেকে শব্দ হল—বৃটিশ সেনাদের পায়ের শব্দ, এবং তারপর কর্কশ গুলি ছোড়া শুরু হলো।
রামু মাথা নীচু করে গীতার হাত শক্ত করে ধরল,
“গীতা, তুই হামার আগে চলে যা।”
কিন্তু গীতাও জানে ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সে রামুর পাশে দাঁড়িয়ে রইল, হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন যেন তার সাহস বাড়াচ্ছে।
কয়েকটি গুলি গীতার কাছে পাশ কাটিয়ে গেল, কিন্তু হঠাৎ একটা গুলি রামুর বুক ভেদ করলো। রামু নিচে পড়ে গেল, মুখ থেকে ছুটে এলো রক্তের ধারা।
“গীতা...,” সে ফিসফিস করল, “মাটি... হামরা আপন মাটিতে ফিরার লাগি দাঙ্গা করলাম... পেটের ছানার নয়া জনমের লাগি...” তার চোখ থেকে জীবন শেষবারের মতো ঝরে পড়ল।
গীতার কান্নার শব্দে জাগলো বনজঙ্গল। তার গলা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ল। সে তার শ্বাসরুদ্ধ করে বাচ্চার জন্য লড়ছিলো, কিন্তু স্বামী হারানোর যন্ত্রণায় সে যেন বাতাস হারিয়ে ফেলল।
রক্তাক্ত রামুর হাত থেকে শেষ নিঃশ্বাস নিয়ে, গীতা নিজের শরীরকে সামলে নিয়ে হাঁটা শুরু করল—সেই ভয়ানক জঙ্গলের মধ্য দিয়ে, যেখানে কেবল শোক আর বেদনার ছায়া।
অবশেষে, গীতা তার বাচ্চাকে জন্ম দিল। বাচ্চাটি জন্ম নিল এ দেশের মাটিতেই—এক বন্দী জীবনের জন্য জন্ম নেয় এক নতুন জীবন।
কিন্তু গীতার চোখে তখন শুধু কান্নার সমুদ্র।
“হামার দুইটা জান লাগে—একটা হারাইলো স্বপ্ন দেখাই করে, আরেকটা জনম নিলো বাঁধাই (বন্দী) মাটির বুকে। হামি স্বপ্ন দেখেছিলুম বাঁচনের (মুক্তির) লাগি, কিন্তু হামার ছানাটা চা বাগানের বাবু সাহেবের জুলুমের শিকলে বাঁধা থাকবেক।”

 -------------------------------------------------------------------------------------------------------------- 

৫.
বাতাস বয়ে যায় চা বাগানের পাতার ওপর, গীতার মুখে অজস্র দুঃখ আর স্মৃতির ছায়া।
ছোট ছেলেটি, ছোট নরম হাত গীতার কাঁধে রাখল। গীতা নীরবে ভাবছিল—নিজ দেশের মাটি কখনো কি দেখবে সে? গীতার চোখে লুকিয়ে আছে হাজারো প্রশ্ন, হাজারো বেদনা। 
সে স্মরণ করল রামুর সাহস, তার ত্যাগ, আর সেই গুলির শব্দ যা পুরো জীবনের মতো রয়ে গেছে তার হৃদয়ে।
“হামাদের দেশ লে দূরে, কিন্তু এথায় তোর জনম বন্দী মাটিতে, হাইরে হামার ল্যাড়কা।”
গীতা নিরবে বুকে তার শিশুকে আঁকড়ে ধরল। চারপাশে গাছপালা, চা পাতার গন্ধ, এবং দূরে দূরে শ্রমিকদের গানের আওয়াজ।
গীতার চোখে অশ্রু জড়ানো হলেও তার মুখে ছিল দৃঢ়তার ছাপ।
“বাকিন, হামদের গল্প শেষ নাই হয়এছে। এই বাগানের মাটি হামদের নতুন জনমের মাটি হবেক—একদিন।”

Advertisement
C

Chandan Rozario

Writer at Talk to the Point — sharing clear, no-fluff insights on topics that matter.

No comments:

Post a Comment